এখন পর্যন্ত যারা আ.লীগের সম্পাদক হয়েছেন

0
153

ডেস্ক রিপোর্ট।। 

বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগের নাম। এদেশের যত আন্দোলন-সংগ্রাম ও অর্জন প্রায় সবকিছুর সাথে দেশের অন্যতম প্রাচীন এ দলটির নাম গেঁথে আছে। 

অসাম্প্রদায়িকতার লড়াই আর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুগ যুগ ধরে অনেক কিংবদন্তী নেতা তৈরি করেছে এই দল। তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতি থেকে উঠে আসা সেই নেতারা ধীরে ধীরে দল পরিচালনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। যাতে আওয়ামী লীগের সাফল্যের পাল্লাও ভারী হয়েছে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ২০টি জাতীয় সম্মেলন হয়েছে। আর আজ ২১ ডিসেম্বর, শুক্রবার বিকেলে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দলটির ২১তম জাতীয় সম্মেলনের। অতীতের সম্মেলনগুলোতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যনির্বাহী কমিটি পর্যায়ে পর্যন্ত শত শত নেতা নির্বাচিত হয়েছেন।

এখন পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এ দলটির সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছে সাতজন নেতা। এদের মধ্যে বর্তমান সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ আটবার পদটি অলঙ্কৃত করেছেন। আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার করে। এ ছাড়া আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ দুইবার এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও আবদুল মালেক উকিল একবার করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আর একবার দলটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন।

আর দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ পদ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এখন পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছেন ৯ জন। সবচেয়ে বেশি চারবার করে পদটির দায়িত্ব পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিল্লুর রহমান। এ ছাড়া তাজউদ্দিন আহমেদ তিনবার, আবদুর রাজ্জাক ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী দুইবার করে, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, আবদুল জলিল এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একবার করে এ পদে নির্বাচিত হন।

গণতান্ত্রিক একটি কর্মী কাউন্সিলের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে জন্ম নেয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৫৫ সালের তৃতীয় জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয় দলটি। যা তখন থেকে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এই সংগঠনটির নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’।

পাকিস্তানি শাসনামল : আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় কাউন্সিল। এতে উদ্বোধনী ভাষণ দেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পরে প্রতিনিধিদের সমর্থন নিয়ে ৪০ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক।

১৯৫৩ সালের ৩ থেকে ৫ জুলাই ‘মুকুল’ সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় কাউন্সিল। এ কাউন্সিলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক থেকে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব নিয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৫৫ সালের ২১ থেকে ২৩ অক্টোবর ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে তৃতীয় কাউন্সিলে দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের। এ কাউন্সিলে প্রথমবারের মতো পাঁচজন নারীও অংশ নেন। এ কাউন্সিলেও সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৫৭ সালের ১৩ জুন আর্মনিটোলার নিউ পিকচার হাউসে এবং পরদিন গুলিস্তান সিমেনা হলে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে প্রতিনিধি সভায় ভোটে তৃতীয়বারের মতো শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালে। ৬ থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ কাউন্সিলে প্রায় এক হাজার কাউন্সিলর ও ডেলিগেট অংশ নেন। এতেও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলটি ছিল আওয়ামী লীগের জন্য ঐতিহাসিক একটি কাউন্সিল। এ কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দলীয় ফোরামে পাস হয়। ১৮ থেকে ২০ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত এ কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দলের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। আর প্রথমবারের মতো সাধারণ সম্পাদক হন তাজউদ্দীন আহমদ। এতে ১ হাজার ৪৪৩ জন কাউন্সিলর ও ডেলিগেট অংশ নেন।

১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাগারে আটক তখন অনুষ্ঠিত হয় দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল। ১৯ থেকে ২০ অক্টোবর হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রায় ১ হাজার ৪৫৩ কাউন্সিলর ও ডেলিগেট এতে অংশ নেন। এতে তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের উত্তাল সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের অষ্টম জাতীয় কাউন্সিল। এ কাউন্সিলের মাধ্যমে ছয় দফা ও ১১ দফা গ্রহণ করে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নেয়। ’৭০ সালের ৪ থেকে ৫ জুন হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় এ কাউন্সিল। এতে ১ হাজার ১৩৮ জন কাউন্সিলর অংশ নেন। তাদের ভোটে তাজউদ্দীন আহমদই পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব : ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭২ সালের ৭ থেকে ৮ এপ্রিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রথম এবং সব মিলিয়ে নবম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সার্কিট হাউজ রোডে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এবং পুনর্বাসনসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য শপথ নেন দলীয় নেতারা। এ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও জিল্লুর রহমান হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ম জাতীয় সম্মেলন ১১২ সার্কিট হাউজ রোডে দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা দলের পদে থাকতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু দলীয় সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

সেবার দলের সভাপতি হন এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং জিল্লুর রহমানই থাকেন সাধারণ সম্পাদক। এরপরই ঘটে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের সেই শোকাবহ ঘটনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন।

ক্ষমতা দখল করে সামরিক সরকার। ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর কারাগারের ভেতরে নির্মমভাবে নিহত হন আওয়ামী লীগের প্রথম সারির চার নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এম মনসুর আলী। দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুঃসময় এসে হাজির হয়।

এমন একটি পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের ৩ থেকে ৪ এপ্রিল হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে দলের ১১তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন কাউন্সিলর এবং সমসংখ্যক ডেলিগেট অংশ নেন। সম্মেলনে দলের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন।

১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হয় দলটির ১২তম জাতীয় সম্মেলন। ৩ থেকে ৫ মার্চ হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে প্রায় এক হাজার ৫০০ কাউন্সিলর এবং সমসংখ্যক ডেলিগেট নিয়ে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে এতে সভাপতি নির্বাচিত হন আবদুল মালেক এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আবদুর রাজ্জাক।

১৯৮১ সালের ১৩তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। দলীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য এ সম্মেলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বে আনা হয়। ’৮১ সালের ১৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে কাউন্সিলর ও ডেলিগেট ছিল তিন হাজার ৮৮৪ জন। এতে শেখ হাসিনা সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮২ সালে আবদুর রাজ্জাক দলত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

১৯৮৭ সালের ১ থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের ১৪তম জাতীয় সম্মেলন। এতে কাউন্সিলর ও ডেলিগেট ছিল প্রায় চার হাজার। সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সম্মেলনেই প্রথমবারের মতো দলের দুই শীর্ষ পদে নারীনেতৃত্ব বেছেন নেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

এরপর ১৯৯২ সালের ১৯ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে দলের ১৫তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়। এতে কাউন্সিলর ছিল প্রায় দুই হাজার ৫০০ ও ডেলিগেটও ছিল সমসংখ্যক। এতে শেখ হাসিনা সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ১৬তম জাতীয় সম্মেলন আওয়ামী লীগের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রায় ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসার পর সেটিই ছিলো দলটির প্রথম জাতীয় সম্মেলন। ৬ থেকে ৭ মে আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে দুই হাজার ৫১৬ কাউন্সিলর এবং সমসংখ্যক ডেলিগেট অংশ নেন। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পুনঃনির্বাচিত হন শেখ হাসিনা ও জিল্লুর রহমান।

২০০২ সালে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় দলের ১৭তম জাতীয় সম্মেলন। এ সম্মেলনে সভাপতি শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আবদুল জলিল।

২০০৭ সালের পটপরিবর্তনের পর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে দলটি। এরপর ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় দলটির ১৮তম জাতীয় সম্মেলন। এ সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

২০১২ সালে ২৯ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় দলটির ১৯তম জাতীয় সম্মেলন। সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here